USS Gerald R. Ford: ইরান কি পারবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার-টি ধ্বংস করতে?
সমুদ্রপৃষ্ঠে ভাসমান এক দানব। মানব সভ্যতার সামরিক প্রযুক্তির এক শিখর মার্কিন নৌবাহিনীর জেরাল্ড ফোর্ড "USS Gerald Ford"। এটি শুধু একটি রণতরী নয়, এটি যেন ভাসমান একটি শহর, একটি চলমান বিমানঘাঁটি, এক চলন্ত যুদ্ধক্ষেত্র। আধুনিক সমুদ্রযুদ্ধে যার উপস্থিতি মানেই শক্তির প্রদর্শন, কৌশলগত বার্তা এবং একটি ভয়ংকর সংকেত।
জেরাল্ড ফোর্ড পরিচালনা করে United States Navy বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী। প্রায় ১,০০,০০০ টনেরও বেশি ওজনের এই সুপারক্যারিয়ার প্রায় ১,১০০ ফুট লম্বা। দু’টি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর দ্বারা চালিত হওয়ায় এটি প্রায় ২৫ বছরেরও বেশি সময় জ্বালানি ছাড়াই সমুদ্রে টিকে থাকতে পারবে। গতি ঘণ্টায় ৩০ নটের বেশি, যা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত অবস্থান বদলাতে সক্ষম।
কতজন মানুষ থাকে এই ভাসমান যুদ্ধক্ষেত্রে?
এই রণতরীতে প্রায় ৪,৫০০ জন পর্যন্ত মানুষ থাকতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ২,৬০০ জন নাবিক ও টেকনিক্যাল স্টাফ এবং প্রায় ১,৮০০ জন বিমান পরিচালনাকারী ও পাইলট। ভাবুন, একটি ছোট শহরের সমান জনসংখ্যা, যারা একইসাথে কাজ করছে, প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, যুদ্ধের প্রস্তুতি রাখছে।
নাবিকদের খাবার ও জীবনযাপন:
প্রতিদিন হাজার হাজার মিল প্রস্তুত হয় এই জাহাজে। গড়ে দিনে প্রায় ১৮,০০০-এরও বেশি খাবারের প্লেট পরিবেশন করা হয়। বিশাল কিচেন, বেকারি, ফ্রিজার রুম সবই রয়েছে। মেনুতে থাকে ডিম, মাংস, মাছ, সবজি, পাস্তা, বার্গার, সালাদ। এমনকি বিশেষ উপলক্ষে স্টেক নাইটও হয়। সমুদ্রে মাসের পর মাস কাটানোর জন্য পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া রয়েছে জিম, মেডিক্যাল সেন্টার, ডেন্টাল ক্লিনিক, চ্যাপেল, এমনকি ছোট দোকান, যা এই রণতরীকে সত্যিকারের একটি ভাসমান নগরীতে পরিণত করেছে।
কতটি যুদ্ধবিমান বহন করতে পারে?
জেরাল্ড ফোর্ড প্রায় ৭৫টির মতো যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার বহন করতে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক স্টেলথ ফাইটার, মাল্টিরোল ফাইটার, আর্লি-ওয়ার্নিং বিমান এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন হেলিকপ্টার।
এই বিমানগুলো ক্যাটাপাল্ট সিস্টেমের মাধ্যমে রানওয়ে ছাড়াই কয়েক সেকেন্ডে আকাশে উড়ে যায়। ফোর্ড-ক্লাসে ব্যবহৃত নতুন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক লঞ্চ সিস্টেম (EMALS) পুরনো স্টিম ক্যাটাপাল্টের তুলনায় আরও দ্রুত, আরও নির্ভুল, এবং কম রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
সমরাস্ত্রে কতটা সজ্জিত?
অনেকে ভাবেন, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার মানেই শুধু বিমান। কিন্তু বাস্তবে এটি নিজেও একটি সমরাস্ত্রের গুদামের চেয়েও বেশি কিছু।
এতে রয়েছে:
নিজস্ব মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম
কাছাকাছি হুমকি মোকাবিলার অটোমেটেড গান
অত্যাধুনিক রাডার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম
শত্রু মিসাইল শনাক্ত হলে প্রথমে দূরপাল্লার ডিফেন্স সিস্টেম তা ট্র্যাক করে। তারপর প্রয়োজন হলে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। আর একেবারে কাছাকাছি চলে এলে স্বয়ংক্রিয় ঘূর্ণায়মান কামান "CIWS system" যা প্রতি মিনিটে হাজার হাজার রাউন্ড শক্তিশালী গুলি ছুঁড়ে যা মিসাইল বা শত্রু ড্রোনকে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে ফেলতে পারে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার কখনো একা থাকে না। এটি সাধারণত একটি “Carrier Strike Group”-এর কেন্দ্রবিন্দু। এর চারপাশে থাকে গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার, সাবমেরিন এবং সাপোর্ট শিপ। অর্থাৎ এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধবহর।
শত্রুর জন্য কতটা ভয়ংকর?
যখন একটি মার্কিন সুপারক্যারিয়ার Persian Gulf-এ প্রবেশ করে, তখন তা শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। আকাশে টহল, সমুদ্রপথে নজরদারি, দূরপাল্লার আঘাত হানার মত ক্ষমতা- সব মিলিয়ে এটি এক ভ্রাম্যমান যুদ্ধশক্তির কেন্দ্র।
এটি থেকে একটি এয়ার উইং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শত শত কিলোমিটার দূরে নির্ভুল আঘাত হানতে পারে। স্টেলথ প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক ওয়ারফেয়ার এবং রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিং সব মিলিয়ে এটি আধুনিক যুদ্ধের এক অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্ম।
ইরান কি পারবে মার্কিন এই সুপারক্যারিয়ারটি ধ্বংস করতে?
বাস্তবিক পক্ষে এটি সত্যিই একটি জটিল প্রশ্ন।
ইরানের কাছে রয়েছে ব্যালিস্টিক মিসাইল, অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, দ্রুতগতির আক্রমণ বোট এবং সাবমেরিন। বিশেষ করে Strait of Hormuz অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সরু জলপথে যেকোনো সংঘর্ষ বিশ্ববাজারে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো- একটি মার্কিন সুপারক্যারিয়ারকে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ:
১. এটি সর্বদা চলমান থাকে
২. এর চারপাশে বহুস্তর প্রতিরক্ষা বলয় থাকে
৩. উন্নত রাডার ও স্যাটেলাইট নজরদারি থাকে
৪. আকাশ, সমুদ্র ও পানির নিচ এই তিন দিক থেকেই এটি কঠিন সুরক্ষা বলয়ে ঘেরা থাকে
কিন্তু “অসম্ভব” শব্দটি যুদ্ধে খুব কমই ব্যবহার করা হয়। আধুনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল প্রযুক্তি এবং ড্রোন কৌশল ভবিষ্যতের যুদ্ধকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। বড় শক্তির মধ্যকার সরাসরি সংঘর্ষ হলে উভয় পক্ষেরই ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাই প্রশ্নটা শুধু “ধ্বংস করা যাবে কি না” এতটুকু নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এমন সংঘর্ষের মূল্য কতটা ভয়াবহ হবে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য?
পরিশেষে বলাযায়:
ভাবুন, সূর্যাস্তের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রজুড়ে। দিগন্তে ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হচ্ছে এক বিশাল ছায়া। ডেকে সারিবদ্ধ যুদ্ধবিমান। জেট ইঞ্জিনের গর্জন। কমান্ড সেন্টারে ঝলমলে স্ক্রিনে শত্রুর গতিবিধি।
একটি বোতাম চাপলেই আকাশে উড়ে যায় ফাইটার জেট। সেকেন্ডের মধ্যে পাল্টে যেতে পারে কৌশল। কয়েক মিনিটেই শুরু হতে পারে আকাশ-সমুদ্রের সম্মিলিত আগ্রাসন।
জেরাল্ড ফোর্ড শুধু একটি জাহাজ নয়, এটি শক্তির প্রতীক। এটি আধুনিক প্রযুক্তি, সামরিক কৌশল ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বিত রূপ। এর উপস্থিতি মানেই প্রতিরোধ, শক্তির প্রদর্শন, এবং কঠোর বার্তা দেয়- “আমরা এখানে আছি।”
কিন্তু একইসাথে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের ক্ষমতা যত বাড়ে, শান্তির প্রয়োজন তত গভীর হয়।
কারণ এমন সুপারক্যারিয়ার যখন সমুদ্রে নামে, তখন শুধু ঢেউ নয়, কাঁপতে শুরু করে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রও।
আপনি যদি এই বিশাল যুদ্ধদুর্গের গল্প শুনে শিহরিত হয়ে থাকেন, তবে মনে রাখবেন- সমুদ্রের গভীরে বা দিগন্তের ওপারে, প্রযুক্তি আর কৌশলের এই দ্বন্দ্বই গড়ে তুলছে ভবিষ্যতের যুদ্ধের চিত্র।
আর সেই ভবিষ্যৎ যা হয়তো আজই লেখা হচ্ছে, সমুদ্রের বুকে।
