" ইসরায়েলের ‘Greater Israel’ পরিকল্পনা এবং ভারতের ভূমিকা! - BD Today Viral

ইসরায়েলের ‘Greater Israel’ পরিকল্পনা এবং ভারতের ভূমিকা!

greater-israel

শনিবার ভোর। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ তখনও পুরোপুরি আলোয় ভরেনি। ঠিক সেই সময় শুরু হয় এক ভয়াবহ সামরিক অভিযান, যাকে অনেক বিশ্লেষক ইতিমধ্যেই “তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনা” বলে উল্লেখ করছেন।


ইসরায়েলের সেই আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই ইসরায়েলের অনেক নাগরিক এবং বিদেশে বসবাসরত কিছু ইরানি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কিন্তু ইরানের ভেতরে শুরু হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগঘন দৃশ্য।


এই যুদ্ধের সূচনা ঘটে এমন এক সময়, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যরকম একটি আশার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। জেনেভা ও ওমানে তখন ইরান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। আলোচনায় ইরান একটি প্রস্তাব দেয়। তারা তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে কমিয়ে আনতে প্রস্তুত, যাতে তা আর কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা না যায়। 


কিন্তু সেই প্রস্তাবের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নেন। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, শুরু থেকেই এই আলোচনাগুলো ছিল কেবল সময়ক্ষেপণের কৌশল। 


ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার পেছনে দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছিল। তারা অপেক্ষা করছিল এমন একটি মুহূর্তের জন্য, যখন ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এক জায়গায় উপস্থিত থাকবে।


শনিবার ভোরে সেই সুযোগ আসে। পাশাপাশি থাকা দুটি ভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ঠিক সেই সময় ইসরায়েলি বাহিনী তাদের আঘাত হানে। 


হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় একই ভাষায় ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের আহ্বান জানান। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। 


খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তেহরানের রাস্তায় মানুষ নেমে আসে। তবে তারা বিক্ষোভ করতে নয়, শোক প্রকাশ করতে। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ আতঙ্কে ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। 


অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধের আসল কারণ শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য। আর তা হলো ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা।


ডোনাল্ড ট্রাম্প বহু বছর ধরে প্রকাশ্যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের নীতির বিরোধিতা করে এসেছেন। ২০২৩ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদদের প্রভাব তিনি কমিয়ে আনবেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন-

“ন্যাশন বিল্ডাররা যত দেশ গড়েছে, তার চেয়ে বেশি দেশ ধ্বংস করেছে।” কিন্তু এখন সেই ট্রাম্প প্রশাসনই মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় যুদ্ধের সূচনা করেছে।


এই হামলার কারণ নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য শোনা গেছে। কখনো বলা হয়েছে এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, কখনো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থামানোর চেষ্টা, আবার কখনো শাসন পরিবর্তনের উদ্দেশ্য। পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এটি ছিল একটি “প্রতিরোধমূলক হামলা”।


অনেকে মনে করেন, এই পরিকল্পনার একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক মহলে এখন একটি ধারণা আলোচিত হচ্ছে- “গ্রেটার ইসরায়েল” “Greater Israel”। এই ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তৃত হবে মিসরের নীল নদ থেকে শুরু করে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত।


এই বৃহত্তর কৌশলে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে ভারত। গত এক দশকে ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। এই সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা। 


মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, দুবাইয়ে হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি আরবের একটি বড় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের গ্যাস রপ্তানিও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।


এখন এই যুদ্ধ শুধু ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।


ইরানের সামনে এখন দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো-ক্রমাগত হামলার মুখে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া এবং শাসনব্যবস্থার পতন। দ্বিতীয়টি হলো-যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো।


যদি ইরান ভেঙে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য নতুন অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে ইউরোপের দিকে যেতে পারে এবং নতুন সংঘাত শুরু হতে পারে।


আর যদি ইরান টিকে থাকে, তাহলে এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও বড় প্রশ্ন তুলতে পারে- একটি এমন যুদ্ধ নিয়ে, যার প্রয়োজনীয়তা হয়তো কখনোই ছিল না।


এই বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র হয়তো আবারও নতুন করে আঁকা হতে যাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের মূল্য দিতে হতে পারে পুরো বিশ্বকেই।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url



অনুসরণকারী