আল-বাসা ১৯৩৮: ব্রিটিশ বাহিনীর আগুনে পুড়ে যাওয়া ফিলিস্তিনি গ্রামের ভয়াবহ ইতিহাস
আল-বাসা ঔপনিবেশিক সহিংসতা, সম্মিলিত শাস্তি এবং বিদ্রোহ-বিরোধী যুদ্ধের মানবিক মূল্যের একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছে। এই ভিডিওটির লক্ষ্য হল ঘটনাটি নথিভুক্ত করা, ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের একটি বিস্মৃত অধ্যায় সম্পর্কে শিক্ষামূলক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করা।
১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর… ব্রিটিশ শাসিত ফিলিস্তিনের আকাশে তখন দমন-পীড়নের কালো ছায়া। গ্যালিলির সীমান্তঘেঁষা ছোট্ট শান্ত গ্রাম- আল-বাসা। খেজুরগাছ, পাথরের ঘর, শিশুদের খেলাধুলা, আজানের ধ্বনি কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই গ্রাম পরিণত হয় আগুন, রক্ত আর চিৎকারের নরকে।
এটি ছিল ফিলিস্তিনি আরব বিদ্রোহের সময়। (১৯৩৬–১৯৩৯) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের গণআন্দোলন। বিদ্রোহ দমাতে ব্রিটিশ বাহিনী নেয় collective punishment- অর্থাৎ একজনের অপরাধে পুরো গ্রামের শাস্তি।
১৯৩৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর একটি রাস্তার মাইন বিস্ফোরণে কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয়। ব্রিটিশ কমান্ডাররা সিদ্ধান্ত নেয়- এর প্রতিশোধ নিতে হবে, নিকটবর্তী গ্রাম আল-বাসা থেকে। প্রমাণ ছিল না, বিচার ছিল না- শুধু প্রতিশোধ।
সকালবেলা ব্রিটিশ সাঁজোয়া গাড়ি গ্রাম ঘিরে ফেলে। মেশিনগানের গুলি চলে টানা প্রায় বিশ মিনিট। মানুষ ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়।
সৈন্যরা ঘরে ঘরে আগুন লাগাতে থাকে। কিছু বাড়িতে তখনও মানুষ ছিল ভেতরে। জ্বলতে থাকে ঘর, উঠান, স্মৃতি-একটি পুরো গ্রাম আগুনে মুছে যায়। একজন ব্রিটিশ সৈন্য পরে স্বীকার করেছিল- “আমরা আগুন দিয়ে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছিলাম।”
গ্রামের প্রায় ৫০ জন পুরুষকে বাড়ি থেকে টেনে বের করা হয়। কারও হাতে অস্ত্র ছিল না- তারা ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, দোকানি। তাদের একসাথে একটি বাসে তোলা হয়। তারপর সেই বাসকে জোর করে চালানো হয় একটি মাইনের ওপর।বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় দেহ। যারা নামতে চেয়েছিল-তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
বেঁচে থাকা গ্রামবাসীদের বাধ্য করা হয় নিজেদের স্বজনদের টুকরো টুকরো দেহ গর্তে দাফন করতে।
শুধু হত্যা নয়, অনেক গ্রামবাসীকে আটক করে সামরিক ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েকজনকে সবার সামনে নির্যাতন করা হয় ভয় দেখানোর জন্য।
এটি ছিল একটি পরিকল্পিত বার্তা- “বিদ্রোহ করলে পুরো গ্রাম ধ্বংস হবে।”
নিশ্চিতভাবে বলা যায়নি কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল। তবে সংখ্যা যতই হোক না কেন-একটি সম্পূর্ণ গ্রাম ধ্বংস হয়েছিল কয়েক ঘণ্টায়।
আল-বাসা আর কখনও আগের মতো দাঁড়াতে পারেনি। ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই,মানুষ আতঙ্কে বাস্তুচ্যুত। এই হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না- বরং ব্রিটিশ বাহিনী বিদ্রোহ দমাতে বহু গ্রামে বাড়ি উড়িয়ে দেওয়া, খাদ্য নষ্ট করা, গণশাস্তি দেওয়ার নীতি ছিল। অর্থাৎ আল-বাসা ছিল একটি বৃহত্তর ঔপনিবেশিক দমননীতির অংশ।
আজ আল-বাসা ফিলিস্তিনি স্মৃতিতে একটি প্রতীক-একটি গ্রামের গল্প, যেখানে বিচার ছাড়াই মানুষ পুড়েছিল, যেখানে শিশুদের শৈশব আগুনে শেষ হয়েছিল। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়-এটি দেখায় কিভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি পুরো একটি সমাজকে শাস্তি দিতে পারে কোনো আদালত, কোনো প্রমাণ ছাড়াই।
আল-বাসা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইতিহাস শুধু যুদ্ধের গল্প নয়, এটি সাধারণ মানুষের গল্প। একটি গ্রামের, একটি মায়ের, একটি শিশুর যাদের নাম আমরা জানি না। কিন্তু যাদের স্মৃতি ইতিহাসে জ্বলছে। ১৯৩৮ সালের সেই আগুন আজও নিভে যায়নি; কারণ স্মৃতি কখনও মুছে যায় না।
