এপস্টেইন ফাইলস: ক্ষমতাবান বিশ্ব নেতাদের অন্ধকার জগত!
এপস্টেইন কে?
বর্তমানের বহুল আলোচিত এবং লোমহর্ষক এক টপিকের নাম- এপস্টেইন ফাইল “Epstein Files” যেটির স্বত্বাধিকার ‘জেফ্রি এপস্টেইন’ (Jeffrey Epstein) । এক বিকৃত মন ও মগজেরও সত্ত্বাধিকারী। আপনি হয়ত এরই মধ্যে তার সম্পর্কে অনেক শুনেছেন। সেই জানাকে আর স্পষ্ট করতেই আমার আজকের উপস্থাপনা। তো প্রথমেই জানব এই এপস্টেইন নামক পশুটি কে??
জেফ্রি এপস্টেইন (Jeffrey Epstein) ছিলেন একজন আমেরিকান ধনী ফাইন্যান্সার। বাইরে থেকে তিনি বিনিয়োগকারী ও দানশীল হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী মেয়েদের যৌ*ন শোষণ ও পাচার চক্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র- যা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত অপরাধ কেলেঙ্কারিগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি কী?
এপস্টেইন কেলেঙ্কারি মূলত একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অপরাধ নেটওয়ার্ক।
এর মূল দিকগুলো:
• অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপে তার বাড়িতে তাদের যৌ*ন নির্যাতন করা হতো
• অভিযোগ আছে- এই মেয়েদের প্রভাবশালী ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কাছে সরবরাহ করা হতো
• বহু বছর ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি আইনি সুবিধা ও প্রভাব ব্যবহার করে বেঁচে যান
• ২০১৯ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারে তার মৃত্যু হয় (সরকারি ভাষ্যমতে: তিনি আত্ম*হত্যা করেন)
এটি একটি সিস্টেমিক সমস্যা প্রকাশ করেছে এই ঘটনা বিশ্বকে দেখিয়েদিয়েছে- টাকা, ক্ষমতা এবং নারী থাকলে কীভাবে কেউ বছরের পর বছর আইনকে পাশ কাটাতে পারে।
বিশ্বব্যাপী প্রকাশ পেয়েছে বহুল আলোচিত Epstein Files।
এই ফাইলগুলোতে রয়েছে হাজার হাজার ভিডিও, লক্ষাধিক নথি ও বিপুল পরিমাণ গোপন রেকর্ড, যা বর্তমান এই আধুনিক বিশ্বকে একটি ভয়াবহ ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে।
নথিগুলোতে যেসব অভিযোগ উঠে এসেছে, সেগুলো গোপনে নয়, বরং ক্ষমতা ও প্রভাবের ছত্রছায়ায়, আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্যেই সংঘটিত হতো বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জেফ্রি এপস্টেইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঞ্চলের একটি নির্জন দ্বীপকে ব্যবহার করতেন এই গোপন নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হিসেবে।
এই আয়োজনগুলোর একটি সাংকেতিক নামও ব্যবহৃত হতো বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই তথাকথিত অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স পর্যন্ত বিশ্বের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের উপস্থিতির কথাও অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে।
ফাইল অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কের মূল কাজ ছিল বিভিন্ন দেশ থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে দের পাচার করে এনে বিশ্বের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের জন্য মনরঞ্জনের ব্যবস্থা করা। তাদের ভয়াবহ শোষণের শিকার করা, যা মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
মার্কিন ধনকুবের বিল গেটস পর্যন্ত এসবের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। রাশিয়ান এক মেয়ের সাথে যৌ*ন সম্পর্ক করে STD রোগে আক্রান্ত হয়েছিল সে। এজন্যে তার ওয়াইফকেও রেগুলার ভ্যাকসিন নিতে হতো।
শুধু বিল গেটসই নয়, নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানীর মাও এসব পাশবিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতো বলে এপস্টাইন ফাইলস-এ উল্লেখ আছে।
সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয় হলো- এই অভিযোগগুলো বছরের পর বছর সামনে আসার চেষ্টা করলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা চাপা পড়ে গেছে। যারা কথা বলার চেষ্টা করেছেন, তাদের অনেকেই খুন, গুম, জেল বা রহস্যজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি উঠেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখাযায়- ২০০৯ সালে একটি পার্টিতে গ্যাব্রিয়েলো রিকো নামের এক মেয়ে রাস্তায় এসে ভয়ার্ত ভাবে চিৎকার করে করে বলছিল- ওরা নরপশু, আমি দেখেছি ওরা মানুষের মাং*স খেয়েছে।
এরপর ওই মেয়েটিকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাকে গুম করে দেয়া হয়েছিল। কি হয়েছিল মেয়েটির ভাগ্যে তা সকলেরই অজানা।
এই নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ব্রাউন নামের এক সাংবাদিকও হেনস্তার স্বীকার হন। পরে তাকে জেলে ভরা হয় এবং ২০১৯ সালে আশ্চর্যজনকভাবে জেলেই তার মৃ*ত্যু হয়। মূলত তাকেও মে*রে ফেলা হয়েছিল।
এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও এপস্টেইন নথিতে উল্লেখ আছে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও অন্ধকার করে তোলে।
এপস্টেইন নামক এই নরপিশাস বাচ্চা মেয়েগুলোকে সাপ্লাই দিতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব বিস্তার, ব্ল্যাকমেইল এবং বিভিন্ন স্বার্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে। ক্ষমতা এবং স্বার্থের লোভেই বছরের পর বছর ধরে এ জঘন্য কাজগুলো করে আসছিল।
'মার্কিন বিচার বিভাগের (DOJ) প্রকাশিত এপস্টাইন ফাইলস- এ উঠে এসেছে এক গভীর অস্বস্তিকর তথ্য। নথি অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ (Kisw)- এর একটি অংশ জেফরি এপস্টাইনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ইমেইলগুলোতে ওই কাপড়ের ধর্মীয় তাৎপর্য অত্যন্ত স্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
ইমেইল ও শিপিং নথিতে যেসব নাম ও তথ্য পাওয়া যায়-
আজিজা আল-আহমাদি, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এক সৌদি নারী, ২২ মার্চ ২০১৭ তারিখে পাঠানো ইমেইলে কিসওয়ার মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি লিখেন- তাওয়াফের সময় এই কাপড়টি “কমপক্ষে এক কোটি মুসলমানের স্পর্শে এসেছে” এবং এতে জমা আছে প্রার্থনা, অশ্রু ও অগণিত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা।
নথি অনুযায়ী, জেফরি এপস্টাইন ছিলেন এর চূড়ান্ত গ্রহীতা। তার মালিকানাধীন LSJE LLC- এর মাধ্যমে কিসওয়ার অংশটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট থমাসে অবস্থিত তার বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ডেলিভারি প্রক্রিয়া সমন্বয় করেন এপস্টাইনের সহযোগী ড্যাফনি ওয়ালেস। সৌদি আরব থেকে সমন্বয় ও সহজোগিতা করেন, সৌদি নাগরিক আব্দুল্লাহ আল-মাআরি।
লজিস্টিকস, কাস্টমস ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল চালমার স্টাউফার লজিস্টিকস। DOJ-এর নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে-
“KISWA - INNER” এবং “KISWA - OUTER” শিরোনামে ইনভয়েস। শিপমেন্ট লেবেলে উল্লেখ: “ARTWORK FROM SAUDI ARABIA” । পরিবহন রুট: সৌদি আরব → মায়ামি → সেন্ট থমাস (USVI)। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, অর্থপ্রদানের রেকর্ড ও ডেলিভারি কনফার্মেশন
এই নথিগুলো প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্ন সামনে আসে-
বিশেষ করে, এত গভীর ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন একটি বস্তু কীভাবে, কোন বিবেচনায় এবং কার স্বার্থে এইভাবে স্থানান্তরিত হলো- সে বিষয়ে নৈতিক দায়বদ্ধতা ও লজ্জাবোধ নিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আজ গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এপস্টাইন ফাইলস-এর লক্ষ লক্ষ নথি এবং ভিডিওর মাঝে কেবল মাত্র সামান্য কিছুই প্রকাশ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। তাতেই যেন কেঁপে উঠলো পুরো বিশ্ব। তাহলে বাকি সব নথি প্রকাশিত হলে কি হতেপারে, তা ভেবে দেখুন একবার। এই ফাইল ফাঁস না হলে আমাদের সভ্য জগতের এত ভয়াবহতা হয়তো কখনোই আমাদের সামনে আসত না।
যাদের আমরা মানবাধিকার, নৈতিকতা ও সভ্যতার মুখ হিসেবে দেখি, তাদের সমাজেই যদি এমন ভয়াবহ অভিযোগ বারবার উঠে আসে, তাহলে নীরবতা কি সত্যিই নিরপেক্ষতা, নাকি ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ?
উল্লেখ্য, জেফরি এপস্টাইন ছিলেন একজন মার্কিন অর্থলগ্নিকারী, যার সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রযুক্তি জায়ান্ট এবং বিলিয়নেয়ারদের ঘনিষ্ঠতা ছিল।
২০১৯ সালে যৌ*ন পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর নিউইয়র্কের এক জেলখানায় তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়, যা আত্ম*হত্যা বলে ঘোষণা করেছিল মার্কিন প্রশাসন।
সদ্য প্রকাশিত এই ফাইলগুলোতে কেবল লারসেনই নন, বরং বিশ্বের আরও অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালীদের নাম উঠে এসেছে। যারা এপস্টাইনের অপরাধী পরিচয় জানার পরও তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
