ইউরোপে হারানো মুসলিম সাম্রাজ্য | Bari Emirate - Italy
ইউরোপের হৃদয়ে, ইতালির দক্ষিণে একসময় গড়ে উঠেছিল এক বিস্মৃত মুসলিম সাম্রাজ্য- বারি আমিরাত "Bari Emirate"। ৮৪৭ থেকে ৮৭১ সাল পর্যন্ত টিকে থাকা এই ইসলামিক রাজ্য ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শক্তির প্রতীক। আজ আমরা তুলেধরেছি- কীভাবে মুসলিমরা ইতালিতে "Italy" পৌঁছেছিল, কীভাবে শাসন করেছিল, এবং কেন বারি সাম্রাজ্য হারিয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়?
সাধারণভাবে আমাদের ধারণা, ইউরোপের মাটিতে ইসলাম পৌঁছেছে স্পেনের আন্দালুসিয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কম মানুষই জানে যে, ইসলাম একসময় ইতালির দক্ষিণেও তার পতাকা উড়িয়েছিল। এই অঞ্চলই ছিল বারি আমিরাত- একটি মুসলিম শাসিত স্বাধীন রাষ্ট্র, যা ৮৪৭ সাল থেকে ৮৭১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।
৮ম ও ৯ম শতাব্দীতে ইসলামী খেলাফত ছিল এক বিশাল শক্তি। আরব মুসলিমরা তখন ভূমধ্যসাগরের দখল নেয়, এবং বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ ও উপকূলীয় শহরে অভিযান চালায়। ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম সৈন্যরা দক্ষিণ ইতালির কিছু অংশে প্রবেশ করে। এর ঠিক ৭ বছর পর, ৮৪৭ সালে, তারা বারি শহর দখল করে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠা করে ইমারাত-ই-বারি, অর্থাৎ বারি আমিরাত।
এই শহরটি ছিল রোমান "Roman", বাইজান্টাইন "Byzantine" এবং লোম্বার্ড "Lombard" সভ্যতার মিলনস্থল। ইসলাম এই অঞ্চলে আসে নতুন সংস্কৃতি, নতুন রাজনীতি ও বৈচিত্র্য নিয়ে। বারি আমিরাতের প্রথম শাসক ছিলেন খালাফ ইবনে ওয়াসিল। তিনি ছিলেন একজন বংশানুক্রমিক আরব বণিক, যিনি উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত সৈন্যদের সহায়তায় বারি দখল করেন।
পরবর্তীতে তিনি নিজেকে আমির ঘোষণা করেন এবং স্বাধীনভাবে শাসন শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে বারি হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী ঘাঁটি, যেখান থেকে মুসলিম সৈন্যরা রোম, নেপলস, ভেনিস ও অন্যান্য শহরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছায়। কিন্তু এই শাসন শুধু দখলদারিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বারিতে গড়ে ওঠে মসজিদ, বাজার, পাঠশালা, এবং ইসলামিক আইনের ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালিত হয়।
ইসলামী সংস্কৃতি বারিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আরবি ভাষা ছিল প্রশাসনিক ভাষা। শহরের স্থাপত্যে ইসলামী প্রভাব পড়তে থাকে। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতে, মুসলিম শাসকরা শুধু ধর্ম নয়, বরং বাণিজ্য ও স্থাপত্যেও নতুন জোয়ার নিয়ে আসে। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো- খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে সেই সময় কিছুটা সহনশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে, আবার অনেক খ্রিস্টানও ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশ নেয়।
কিন্তু বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কখনোই এখানে মুসলিম শাসন মেনে নিতে পারেনি। একসময় তারা পশ্চিম ইউরোপের কিছু খ্রিস্টান রাজ্যের সঙ্গে মিলে বারি পুনর্দখল করার পরিকল্পনা করে। ৮৭১ সালে বাইজান্টাইন ও ফ্রাঙ্ক বাহিনী একযোগে বারিতে আক্রমণ চালায়। দীর্ঘ অবরোধ শেষে আমিরাত ধ্বংস হয়, এবং শেষ আমির সাওদান বন্দি করে কনস্টান্টিনোপল "Constantinople" -এ পাঠানো হয়। এর মধ্য দিয়ে ২৪ বছরের ইসলামি শাসনের ইতি ঘটে।
ইতিহাসের বইগুলোতে বারি আমিরাতের নাম হয়তো বড় করে লেখা নেই, কিন্তু যারা গবেষণা করেছেন, তারা জানেন এর গুরুত্ব কতখানি। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম শুধুমাত্র পূর্ব দিক দিয়ে নয়, ইউরোপের একেবারে হৃদয়েও পৌঁছে গিয়েছিল। বারি ছিল ইউরোপে ইসলামের সাময়িক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিস্তার। এই শহর ছিল একটি কালচারের মেলবন্ধন, যেখানে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম এবং বাইজান্টাইন ঐতিহ্য একত্রে অবস্থান করেছিল।
ইসলামের এই বিস্তার আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইসলাম শুধুই যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং সংস্কৃতি, শিক্ষা, জ্ঞান ও উন্নত প্রশাসন দিয়েও বিশ্বকে পরিবর্তন করেছিল।
বারির মতো ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো এই বিস্তারের নিদর্শন। তারা দেখিয়ে দেয় যে, ইসলামের সোনালী যুগ শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকা নয়- ইউরোপের ভিতরেও তার ছায়া বিস্তার করেছিল।
আজকের আধুনিক ইতালির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বারি শহর হয়তো চুপ করে আছে, কিন্তু তার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের ছাপ। যদি আপনি একদিন বারি যান, মনে রাখবেন- এই শহর একদিন ছিল ইসলামের দূর্গ। এই ছিল ইতালির বারি সাম্রাজ্য- ইসলামের হারানো গৌরব।
প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে কমেন্টে মতামত জানান, আর ইতিহাসপ্রেমীদের সঙ্গে শেয়ার করুন। এমন আরও অজানা ইতিহাস জানতে আমাদের সঙ্গে থাকুন-!


