" এক দ্বীপ দুই দেশ! Big Diomede Island: যেখানে আজ থেকে দেখা যায় আগামীকাল - বিডি টুডে ভাইরাল

এক দ্বীপ দুই দেশ! Big Diomede Island: যেখানে আজ থেকে দেখা যায় আগামীকাল

Time_travel_big_diomede_and_little_diomede_island
Big Diomede Island

আপনি কি জানেন এমন একটি দ্বীপ আছে যেখানে আপনি এক পা রাখলে থাকবেন রাশিয়ায়, আর আরেক পা থাকলে আমেরিকায়?


বিগ ডায়োমিড দ্বীপ "Big Diomede Island" হলো এমনই এক বিস্ময়, যেখানে সময়, রাজনীতি ও ভৌগোলিক রহস্য একসাথে মিশে গেছে। টাইম ট্র্যাভেল "Time Travel" শীতল যুদ্ধ, বরফে হাঁটা – সবকিছুর সাক্ষী এই দ্বীপ।


আপনি কি কখনও এমন জায়গার কথা শুনেছেন, যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি “আগামীকাল” দেখতে পারেন? অথবা যেখানে মাত্র ৩.৮ কিলোমিটার দূরত্ব থাকলেও দুটি দেশ, দুটি মহাদেশ, এমনকি দুটি ভিন্ন সময় একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে?


এই রহস্যময় জায়গাটির নাম বিগ ডায়োমিড। এটা শুধু একটা দ্বীপ নয়- এ এক ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক আর রাজনৈতিক বিস্ময়।


ডায়োমিড দ্বীপজোড়ার পরিচয়

বিগ ডায়োমিড ও লিটল ডায়োমিড- এই দুটি দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা আর রাশিয়ার পূর্ব প্রান্তে, বেরিং সাগরের মাঝখানে অবস্থিত।


দুটি দ্বীপের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র ৩.৮ কিলোমিটার বা ২.৪ মাইল। তবে মজার ব্যাপার হলো, এদের মধ্যে রয়েছে ২১ ঘণ্টার সময় পার্থক্য! এ কারণে এদের বলা হয় - টুমরো আইল্যান্ড "Tomorrow Island" আর ইয়েস্টারডে আইল্যান্ড "Yesterday Island" ।


টাইম জোনের খেলা 

বিগ ডায়োমিড দ্বীপটি রাশিয়ার অংশ, আর লিটল ডায়োমিড যুক্তরাষ্ট্রের। এই দুটি দ্বীপের মাঝখান দিয়েই চলে গেছে ইন্টারন্যাশনাল ডেটলাইন (IDL)।


ফলে যখন লিটল ডায়োমিডে সোমবার সকাল ৯টা, তখন বিগ ডায়োমিডে ইতিমধ্যেই মঙ্গলবার সকাল ৬টা! শুধু দুটি দ্বীপই নয়, এ যেন দুটি আলাদা সময়, দুটি আলাদা জগৎ!


বিগ ডায়োমিড- রাশিয়ার প্রহরী দ্বীপ 

বিগ ডায়োমিড দ্বীপটি একেবারে জনমানবহীন, সাধারণ মানুষ এখানে থাকতে পারে না। এই দ্বীপটি রাশিয়ার সেনাবাহিনীর অধীনে এবং এখানে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।


বিশেষ অনুমতি ছাড়া এই দ্বীপে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একে অনেক সময় বলা হয় “আইসোলেশন দ্বীপ”।


লিটল ডায়োমিড – যুক্তরাষ্ট্রের ছোট্ট বসতি 

অন্যদিকে, লিটল ডায়োমিড দ্বীপে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র ইনুপিয়াক "Inupiat" সম্প্রদায়ের বসতি। মাত্র ৮০–৯০ জন বাসিন্দা এখানে বসবাস করেন। তারা বরফ জলে মাছ ধরা, শিকার ও ছোট আকারের পর্যটনেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এটাই যুক্তরাষ্ট্রের “সময়-দেখা যায় এমন সীমান্ত”!


এক পা রাশিয়ায়, এক পা আমেরিকায়! 

শীতে, যখন বেরিং সাগর বরফে জমে যায়, তখন এই দুই দ্বীপের মাঝে বরফের রাস্তা তৈরি হয়।কয়েকজন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ বরফের ওপর হেঁটে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে গেছেন- এ যেন সময়ের ভিতর দিয়ে হাঁটা। তবে এটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিপজ্জনক।


১৯৮৭ সালে এক রুশ সাঁতারু লিন্ডা পি স্ট্রেট বরফ ঠেলে এই পথ সাঁতরে পেরিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় “স্বাভাবিক পাসপোর্ট ছাড়া টাইম ট্র্যাভেল”।


ইতিহাসের পাতা – রুশ-আমেরিকান দ্বন্দ্ব 

১৮৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র আলাস্কা কিনে নেয় রাশিয়ার কাছ থেকে। তখন থেকেই দুটি দ্বীপ দুটি দেশের হয়ে যায়। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় বিগ ডায়োমিড ছিল রাশিয়ার কড়া সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকা।


তারা দ্বীপটিকে বানিয়ে তোলে একটি বাফার জোন "Buffer zone" যাতে আমেরিকার কেউ যাতে রাশিয়ার দিকে না আসতে পারে।


সামরিক কৌশল ও নজরদারি 

বিগ ডায়োমিড থেকে নজরদারি করা হয় পুরো বেরিং স্ট্রেইট অঞ্চলে। এটা রাশিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান, যেখান থেকে সহজেই আমেরিকার নৌপথে নজর রাখা যায়। সেটেলাইট কমিউনিকেশন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, ও রাডার নিয়ন্ত্রণ- সবই চলে এখান থেকে।


আবহাওয়া ও প্রকৃতি 

দ্বীপ দুটোতে বছরের ৮–৯ মাস বরফে ঢাকা থাকে। তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এই এলাকার পরিবেশ খুবই প্রতিকূল, তাই এখানে কৃষি বা অন্য সাধারণ জীবিকা গড়ে ওঠেনি।


তবে এখানে রয়েছে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়, সাগরের গর্জন আর মেঘে ভেসে থাকা দিগন্ত।


পর্যটন ও আগ্রহ 

অনেকেই এই দ্বীপজোড়া দেখতে চান, তবে বিগ ডায়োমিডে যাওয়া নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ কিছু এক্সপেডিশন বা গবেষণা দলের অনুমতি থাকলে সীমিত সময়ের জন্য ঘুরে দেখা যায়।


লিটল ডায়োমিডে হেলিকপ্টারে যাওয়া যায় এবং পর্যটকরা এখান থেকেই বিগ ডায়োমিডের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন! এটা বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত সীমান্ত অভিজ্ঞতা।


এক দ্বীপ, দুই পৃথিবী 

বিগ ডায়োমিড আমাদের শেখায়, পৃথিবী কতটা জটিল ও বিস্ময়কর হতে পারে। এটা শুধু একটা দ্বীপ নয়- এটা হলো সময়ের ফাটল, দুই বিশ্বশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাহাড়ি দ্বীপ।


এ যেন এক অদৃশ্য দেয়াল, যেটা তৈরি হয়েছে সময়, রাজনীতি আর ভূগোল দিয়ে। আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু ভাবি- আমরা কতটুকুই বা জানি আমাদের পৃথিবীকে!



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url