Earthquake Bangladesh | জেগে উঠছে বাংলাদেশের নিচে ঘুমিয়ে থাকা ৮০০ বছরের ভূমিকম্প দানব
Why is Dhaka shaking so frequently? Is Bangladesh sitting on a major seismic threat?
ঢাকায় কি আমরা ক্রমেই বড় কোনো ভূমিকম্পের ''Earthquake'' দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকার আশেপাশে প্রায়ই ক্ষুদ্র বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে।
অনেকেই ভাবছেন, কেন এত ঘনঘন কম্পন হচ্ছে? এর পেছনে কি কোনো বড় ঝুঁকি লুকিয়ে আছে? আজকে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ এবং ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার ভিত্তিতে জানবো- ঢাকার আশেপাশে কেন বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী ধরনের ভয়াবহতার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূ-পৃষ্ট আলাদা আলাদা বিট বা প্লেট টেকটোনিক দিয়ে তৈরি হয়েছে,
যা নিচের নরম পদার্থের ওপরে ভাসছে। এগুলো যখন
সরে যায় বা নড়াচড়া করতে থাকে বা একটি অন্যদিকে ধাক্কা দিতে থাকে, তখন ভূ-তত্ত্বের মাঝে
ইলাস্টিক এনার্জি শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে।
সেটা যখন শিলার ধারণ ক্ষমতার পেরিয়ে যায়, তখন সেই শক্তি কোন
বিদ্যমান বা নতুন ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে। তখন ভূ-পৃষ্টে কম্পন তৈরি হয়, সেটাই হচ্ছে
ভূমিকম্প।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে মাঝে মধ্যেই যেসব ভূকম্পনগুলো
অনুভূত হয়, যার উৎস সাধারণভাবে বাংলাদেশের বাইরে এবং এই শহর থেকে ২০০/৩০০ কিলোমিটার
দূরে।
ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইল বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের লালমাটি
থেকে যমুনার পললভূমি-যেটা ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত, এই পুরো ৭০ কিলোমিটার
এলাকা জুড়ে এই ফল্ট।
গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অঞ্চল,
যেখানে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল। এখানে একটি প্লেট আরেকটার নীচে তলিয়ে যাচ্ছে। সেটি
হলো-ইন্ডিয়া প্লেট বার্মা প্লেটের নীচে তলিয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জের হাওড় হয়ে মেঘনা
নদী হয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বরাবর ওই প্লেটটি তলিয়ে যাচ্ছে। এই সাবডাকশান জোনই হলো
ভূমিকম্পের উৎস স্থল।
আমাদের গবেষণা দেখা গেছে এই সাবডাকশান জোনে যে পরিমাণ শক্তি
সঞ্চয় হয়ে আছে তার মাত্রা ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রা পর্যন্ত। সাধারণত বড় ধরণের ভূমিকম্পগুলো
এমন জোনেই হয়। যেটা চিলি, আলাস্কা বা জাপানেও দেখা যায়।
বাংলাদেশ অঞ্চলে ভূমিকম্পের আরেকটি উৎস হলো ডাউকি ফল্ট, যেটি
শেরপুর থেকে শুরু জাফলং হয়ে ভারতের করিমগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষ করে এর পশ্চিমাংশ
আরেকটা ভূমিকম্পের উৎস।
বাংলাদেশ একটি সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চল। বাংলাদেশ ভূগোলের দিক থেকে তিনটি বড় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। সেগুলো হলো-ইন্ডিয়ান প্লেট “Indian plate”, ইউরেশিয়ান প্লেট “Eurasian Plate”, এবং বার্মা বা আরাকান প্লেট “Arakan Plate”।
এই তিনটি প্লেটের মধ্যে চাপ ও ধাক্কা তৈরি হয় নিয়মিত। যখন প্লেটগুলোর মধ্যে চাপ জমতে জমতে হঠাৎ ভেঙে যায় বা সরে যায়, তখনই ভূমিকম্প হয়। ঢাকার পাশে অবস্থিত মাধবপুর ফল্ট, দাউদকান্দি ফল্ট, ডাউকি ফল্ট, এবং বাংলাদেশের পূর্ব দিকের আরাকান ট্রেঞ্চ পুরো অঞ্চলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সেই জায়গাগুলোর একটি যেখানে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা খুবই বেশি।
ঢাকা শহর সরাসরি কোনো বড় ফল্ট লাইনের ওপর বসে না থাকলেও এর চারপাশে আছে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট। এসব ফল্টে সামান্য নড়াচড়াও রাজধানীতে অনুভূত হয়।এর প্রধান কারণ ঢাকার ভূগঠনে রয়েছে দুর্বল অলুভিয়াল (মাটি-নরম) স্তর।
এই মাটি ভূকম্পনকে বাড়িয়ে তোলে, যাকে বলা হয় “সিসমিক অ্যামপ্লিফিকেশন”। অর্থাৎ, ৫ মাত্রার ভূমিকম্প অন্য শহরে কম টের পাওয়া গেলেও ঢাকায় বেশি কেঁপে ওঠে।
পৃথিবীর ভূগর্ভে প্লেটের চাপ একদিনে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর, কখনও দশকের পর দশক ধরে চাপ জমতে জমতে কোনো একসময় তা ভূমিকম্পে রূপ নেয়। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্লেট সীমানায় বিশাল চাপ জমে আছে এমনটাই দেখাচ্ছে সাম্প্রতিক জিওসায়েন্স গবেষণা।
তাই ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে বারবার। এগুলোকে বলা হয় “স্ট্রেস অ্যাডজাস্টমেন্ট ট্রেমর”।
এই ছোট ঝাঁকুনি ইঙ্গিত দেয় মাটির নিচে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সিস্টেম নিজেকে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এই ছোট কম্পনগুলো হয়তো বড় ভূমিকম্পের পূর্বসূরি।
ঢাকা অঞ্চল তিনটি বড় ভূমিকম্প হুমকিতে রয়েছে।যথা-
১) ডাউকি ফল্ট “Dawki Fault” (বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত) বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ফল্ট লাইন।এখানে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সক্ষমতা আছে।
২) আরাকান মেগা-থ্রাস্ট “Arakan Mega-Thrust” মিয়ানমারের কাছে অবস্থিত এই ফল্ট এক ধরনের সুপার ভূমিকম্প “Super earthquake” তৈরি করতে পারে।শক্তি ৮.৫ থেকে ৯ মাত্রা পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা।
৩) ঢাকার আশেপাশের স্থানীয় ফল্টগুলো। যেমন- মাধবপুর ও দাউদকান্দি ফল্ট “Daudkandi Fault”। এগুলো ছোট হলেও ঢাকায় সরাসরি কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায়
দেখেছেন সাবডাকশন জোনে বড় আকারের দুটো ভূমিকম্পের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান হচ্ছে ৮০০
থেকে ৯০০ বছর।
কুমিল্লা ময়নামতি পাহাড়ে বৌদ্ধ বিহারের যে স্থাপনা ওই এলাকা থেকে লোকজন অভিবাসন করে চলে গেছে ৮০০ থেকে ১,০০০ বছর আগে। তাদের এই অভিবাসনের সঙ্গে ভূমিকম্পের সম্পর্ক ছিল।
তাহলে
আমরা ধরে নিতে পারি এখানে যে শক্তি সঞ্চিত ছিল সেটা ৮০০ বা ১০০০ বছর আগে ছেড়ে দিয়েছে
এবং নতুন করে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এখানে দুর্বল ভবন, এলোমেলো নির্মাণকাজ, সরু রাস্তা, ঘনবসতি সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই ঢাকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। কারণ ভবনের বড় অংশই সিসমিক স্ট্যান্ডার্ড মেনে নির্মিত নয়।
ঢাকায় বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এটি পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের স্বাভাবিক চলাচলের ফল এবং ঢাকার ভূগঠন ও অবস্থানের কারণে তা আরও বেশি অনুভূত হয়।
কিন্তু আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল-প্রস্তুত থাকা। কারণ ভূমিকম্প কখন হবে, কোথায় হবে তা কেউ বলতে পারে না। তবে প্রস্তুতি নিলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো যায়।
