মাচুপিচু: ইনকাদের হারানো শহরের রহস্য | Machu Picchu – Lost City of Peru
পেরুর "Peru" আন্দিজ পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত মাচুপিচু শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ইনকা সাম্রাজ্যের বিস্ময়কর এই শহর কীভাবে গড়ে উঠলো, কেনই বা এটি পরিত্যক্ত হলো? জেনে রাখুন আবিষ্কার থেকে আধুনিক পর্যটন পর্যন্ত মাচুপিচুর পূর্ণ ইতিহাস-
পেরুর আন্দিজ পর্বতের উপরে মেঘে ঢাকা এক বিস্ময়কর শহর, যার রহস্যময় সৌন্দর্য আজও দুনিয়ার মানুষকে আকৃষ্ট করে চলেছে। নাম- মাচুপিচু "Machu Picchu" । হাজার হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই শহর কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, বরং এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, আর এক অভাবনীয় আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে নির্মাণ করেছিল এই শহর? কেনই বা এমন দুর্গম স্থানে গড়ে তোলা হয়েছিল এই স্থাপনা? আর কেনই বা হঠাৎ করেই এটি পরিত্যক্ত হলো?
আজ আমরা জানব মাচুপিচুর জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত তার এক অনন্য গল্প, যার মধ্যে রয়েছে ইনকা সভ্যতার উত্থান-পতন, নির্মাণশৈলীর অসাধারণতা, এবং আধুনিক যুগের বিস্ময়।
১৯১১ সাল। এক আমেরিকান ইতিহাসবিদ এবং অভিযাত্রী হিরাম বিংহাম আন্দিজ পর্বতের মধ্যে এক হারানো শহরের খোঁজে রওনা হন। স্থানীয় কুইচুয়া সম্প্রদায়ের সহায়তায়, অবশেষে তিনি আবিষ্কার করেন মাচুপিচু- পাথরের এক পরিপাটি শহর, যেটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে ছিল। তবে, স্থানীয় জনগণ অবশ্যই জানত এই শহরের অস্তিত্ব। তারা একে বলত "পুরানো শিখর", যার কুইচুয়া নামই হচ্ছে ‘মাচু পিচু’।
মাচুপিচু নির্মিত হয়েছিল ১৪৫০ সালের দিকে, ইনকা সম্রাট পাচাকুতি ইনকা ইউপানকির শাসনামলে। এটি ছিল একধরনের আধ্যাত্মিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র, যেটি সম্ভবত রাজপরিবারের অবকাশযাপন বা ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
শহরটির স্থাপত্যশৈলী বিস্ময়কর। এখানে প্রায় ২০০টি পাথরের ভবন, মন্দির, টেরেস, ঝরনা ও ধ্যানের স্থান রয়েছে। এর সবকিছু নির্মিত হয়েছে পাথর কেটে, কোনো ধরনের মর্টার ছাড়াই। এত নিখুঁতভাবে পাথর কাটা হয়েছে, যেন সেগুলো একে অপরের মাঝে লেগে গেছে! ভূমিকম্পেও এসব গঠন নড়ে না।
মাচুপিচু ইনকাদের ধর্মীয় জীবন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে রয়েছে ‘ইন্তিহুয়াতানা’ "Intihuatana" নামের একটি পাথরের স্তম্ভ, যা সূর্যঘড়ির মতো ব্যবহার করা হতো। ইনকারা বিশ্বাস করতো,-
সূর্যদেবতার শক্তিকে এই পাথরের মাধ্যমে ধারণ করা যায়। তাছাড়া, অনেক ভবনের জানালা এমনভাবে নির্মিত, যা নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলো ফিল্টার করে ভেতরে ঢুকত।
১৫৩০- এর দশকে যখন স্প্যানিশরা দক্ষিণ আমেরিকা দখল করে নেয়, তখন ইনকা সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, স্প্যানিশরা কখনোই মাচুপিচুর সন্ধান পায়নি। তাই এটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, ইনকারা কেন পরিত্যাগ করেছিল এই শহর? একটি মত বলছে, ইউরোপীয় সংক্রমণজনিত রোগ, আরেকটি মত বলে রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে। যাই হোক, পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে শহরটি গাছপালা আর প্রাকৃতিক ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়ে যায়।
হিরাম বিংহাম "Hiram Bingham" এর আবিষ্কারের পর, দীর্ঘদিন ধরে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা চলতে থাকে। বিংহাম কিছু নিদর্শন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান, যা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। বর্তমানে পেরু সরকার এসব মূল্যবান নিদর্শন ফেরত আনার দাবি করছে।
বর্তমান গবেষণায় জানা গেছে, মাচুপিচু ছিল সুপরিকল্পিত একটি শহর। এর জলব্যবস্থা, কৃষিক্ষেত্র, টেরেসিং ব্যবস্থা, এমনকি বৃষ্টিপাত ও সেচের ব্যবস্থা পর্যন্ত অত্যন্ত উন্নত ছিল। বলা যায়, আধুনিক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এটি।
২০০৭ সালে মাচুপিচুকে "নতুন সপ্তাশ্চর্যের" তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতি বছর প্রায় ১৫ লক্ষ পর্যটক এই বিস্ময়কর শহর দেখতে আসেন।তবে পর্যটন বাড়ার ফলে পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। পেরু সরকার বর্তমানে দর্শনার্থীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। যারা হাঁটার মাধ্যমে এই শহরে পৌঁছাতে চান, তাদের জন্য রয়েছে বিখ্যাত ইনকা ট্রেইন- একটি চ্যালেঞ্জিং কিন্তু অসাধারণ সুন্দর যাত্রা।
মাচুপিচু শুধু একটি নিদর্শন নয়, এটি মানব সভ্যতার উদ্ভাবনী শক্তি, প্রকৃতির সাথে মানুষের সামঞ্জস্য, এবং হারানো ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠশালা। ইনকা সভ্যতা যে কতটা উন্নত ছিল, মাচুপিচু তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায়, টেকসই জীবনযাপন এবং প্রকৃতির প্রতি সম্মানই একটি সভ্যতার দীর্ঘস্থায়ীতার চাবিকাঠি।
মাচুপিচু আমাদের মনে করিয়ে দেয়- যত কিছুই হারিয়ে যাক, ইতিহাস কখনো হারায় না। শুধু জানতে হয় সঠিক সময়ে, খুঁজে নিতে হয় সঠিকভাবে।
বিস্তারিত দেখুন-


